শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরই স্বয়ং শ্রী হরি ।
আজকের পর্বে রয়েছে হরিচাঁদ ঠাকুরের আবির্ভাবের পটভূমি সম্পর্কে।
স্রষ্টার সৃষ্টির সবকিছুই একটা সুশৃঙ্খল নিয়মাধীনে চলেছে। কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রাকৃতিক শক্তি সেখানে শৃঙ্খলা বা সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। এই সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য মাঝে মাঝে এই ধরার বুকে অবতার রূপে ভগবানের আবির্ভাব হয়। আর এ কারণেই পূর্ণব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিচাঁদের আবির্ভাব হয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পৃথিবীতে এক মহা দুর্দিনের ঝড় বয়ে গিয়েছিল । কি ধর্ম জীবন , কি রাষ্ট্র জীবন, কি সমাজ জীবন সর্বত্রই যেন এক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল । কিছু সংখ্যক স্বার্থন্বেষী মানুষ সাধারণ মানুষের সততা ও সরল ধর্ম বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ধর্মের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। ধর্ম হয় শোষণের হাতিয়ার। ধর্মের বিকৃতি ঘটিয়ে ধর্মকে সীমিত গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়। ধর্মের আবরণে এক শ্রেণীর ভন্ডের দল অনাচার ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। ধর্মে দেখা দেয় গ্লানি। মানুষ ধর্মহীন হয়ে এক প্রাণহীন সত্ত্বায় পরিণত হয়। যার ফলে পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হয়। প্রয়োজন দেখা দেয় ভগবানের আবির্ভাবের। ত্রেয়দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমাজের উপর ব্রাহ্মণ্য বাদের অধিপত্য বিস্তার লাভ করে। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়। ধীরে ধীরে জাতিভেদ প্রথা সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। তাদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হয়। এমনকি হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদ পাঠ, শ্রবণও নিষিদ্ধ করা হয়। এ সময় তৎকালীন রাষ্ট্র নায়কদের ছত্র ছায়ায় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এদেশের আদি অধিবাসীদের উপর অকথ্য অত্যাচার নির্যাতনে ত্রাস সৃষ্টি করে। এর ফলে অনেকে জাতিচ্যুত হয়ে ধর্মান্তরিত হয়। অনেকের ধন সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়। সমাজ ব্যবস্থায় চরম ভেদ - বৈষম্য হওয়ায় একদল মানুষকে হীন, পতিত ও অবহেলিত করে রাখা হয়। তাছাড়া ছুৎমার্গের বিষবাষ্পে সমাজ জীবনে নেমে আসে এক অশান্তির কালো ছায়া। এই ছুৎমার্গীদের নিষ্পেষণে অতিষ্ট হয়ে দোলে দোলে অবহেলিত নির্যাতিত লোক ধর্মান্তরিত হতে থাকে। এসময়ে সমাজে গুরুবাদ ও গুরুমন্ত্রের খুব প্রভাব বিস্তার করে। প্রেমহীন গুরুর দেয়া প্রাণহীন মন্ত্রসাধনাই ধর্মের চূড়ান্ত বলে বিশ্বাস করতে জনসাধারণ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে নিষ্ঠা, প্রেম, পবিত্রতা, প্রভৃতি সদগুণের অনুশীলন অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচিত হতো না। অসহায় মানুষের চরম দুর্দিনে, মনুষ্যত্বের চরম লাঞ্ছনায় মানবাত্মা যখন ডুকরে কেঁদে উঠে প্রতিকারের পথ খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন নিঃস্ব, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে এবং ধর্মকে রক্ষার জন্য পূর্ণব্রহ্মের আবির্ভাবের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই পূর্ণব্রহ্মই হলেন পরম প্রেমময় যুগাবতার শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর। অবতারের আবির্ভাবের কারণ সম্পর্কেশ্রী শ্রী গীতায় বলা হয়েছে -
" যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানধর্মস্য তদাত্মানাং শ্রীজামম্যহম ।।
পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায়চ দুষ্কৃতাম।
ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।
কবি রসরাজ তারক সরকার লিখিত শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থে হরি অবতারের বর্ণনা সুন্দরভাবে দেওয়া আছে।
'জীবদ্বারে, প্রেমদান, প্রতিজ্ঞা পালন।
অন্নপূর্ণা শচীবাঞ্ছা করিতে পূরণ।।
বৈষ্ণবের কুটিনাটী খণ্ডন কারণ।
জীব উদ্ধারের জন্য হইল মনন।।
সে কারণে অবতার হৈলো প্রয়োজন।
সফলা নগরী যশোবন্তের নন্দন।।
উপরোক্ত কথাগুলির মধ্যে হরিচাঁদের অবতার হওয়ার পূর্ব সূত্র রয়েছে।
চৈতন্য ভাগবতের মধ্যম খন্ডে ২৬শ অধ্যায়ে দেখা যায় গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তাঁর মাকে বলেছেন -
আরো দুই জন্ম এই সংকীর্তনারম্ভে।
হইব তোমার পুত্র আমি অবিলম্বে।।
এই মত তুমি মোর মাতা জন্মে জন্মে।
তোমার আমার কভু ত্যাগ নাহি মর্মে।।
শ্রীজীব গোস্বামীকৃত 'চৈতন্য চরিত' গ্রন্থেও লেখা আছে মহাপ্রভু তাঁর মাকে বলেছেন -
তোমাকে এড়াতে শক্তি নাহিকো আমার।
তব গর্ভে জন্ম নিবো আরো দুই বার।।
শেষ জন্ম নিব মাগো ঐশান্য কোণে।
হরিনামে মাতাইবো সর্বজীব গণে।।
উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের কথা অনুসারে মহাপ্রভুর দুই জন্মের এক জন্ম খেতরে শ্রীনিবাস রূপে। তাহলে দ্বিতীয় জন্ম কোথায়? গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্ম নদীয়ায় হলেও লীলা সাঙ্গ করেন ওড়িষ্যার পুরীতে। সেখান থেকে ঈশান কোণে ওড়াকান্দি অবস্থিত। তাই বলা যায় তিনি পুনরায় ওড়াকান্দিতে হরিচাঁদ রূপে এসে কলির জীবদের হরিনাম দান করে সেই প্রতিজ্ঞা পূরণ করেছেন।
হরি অবতারের আরো একটি প্রমান মেলে নারদীয় পুরানে। সেখানে আছে -
কালৌ প্রথম সন্ধ্যায়ং লক্ষীকান্ত ভবিষ্যামি।
সন্ন্যাস গৌরবিগ্রহে শান্তয়ে পুরুষোত্তমে।।
ভবিষ্য় পুরানে আছে -
ওঁ সত্য যুগে মৎস্য-কুর্ম-বরাহ-নৃসিংহা :।
ত্রেতা যুগে বামন-পরশুরাম-শ্রী রাম চন্দ্রায় :।
দ্বাপর যুগে কৃষ্ণ বুদ্ধো,
কলিযুগে প্রথম সন্ধ্যায়াং কৃষ্ণদাসী গতা ।
তথার্পিতং শ্রী গৌরাঙ্গ কলেবরং,
তথা ঈশানং হরিরূপং ভবিষ্যামি।।
শ্রী চৈতন্য ভাগবতের মধ্যম খন্ডে ২৬শ অধ্যায়ে দেখা যায় যে, গৌরাঙ্গের সন্ন্যাস গ্রহণের ইচ্ছা শুনে তাঁর ভক্তগণ তাঁর বিরহে ব্যাকুল হলে তিনি তাদের প্রবোধ দেন এই বলে-
সর্বকাল তোমরা সকল মোর সংগ।
এই জন্ম হেনো না জনিবা জন্ম জন্ম।।
এই মত আরো আছে দুই অবতার।
কীর্তন আনন্দরূপ হইবে আমার।।
তাছাড়া শ্রী শ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থে কবি রসরাজ তারক চন্দ্র সরকার আরো একটি প্রমান দিয়েছেন। মহাপ্রভু যখন দারুব্রহ্ম বিগ্রহের সঙ্গে মিশে গিয়ে লীলা সাঙ্গ করেন তখন ভক্তগণ বিরহে কাতর হয়ে উক্ত বিগ্রহের উপর চড়াও হন। তখন শুন্য বাণী হয় -
মানুষে আসিয়া, মানুষে মিশিয়া
করিবো মানুষ লিলে।
সেইতো সময়, পাইবে আমায়
পুনশ্চ মানুষ হলে।।
উপরোক্ত প্রমান সাপেক্ষে আমরা বলতে পারি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুই যে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ রূপে শ্রীধাম ওড়াকান্দি এসে জন্ম গ্রহণ করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
Comments
Post a Comment